ব্রান্ডের চশমার এত মুল্য কেন?

নাইন অপটিকের সম্মানিত কাস্টমার একটা বড় অংশের প্রশ্ন, ব্রান্ডের অরিজিনাল চশমার কেন এত দাম? সামান্য প্লাস্টিক, অথবা মেটাল দিয়ে তৈরি একটা চশমার দাম কেন এত হবে? কি আছে একটা চশমার ভেতর যার দাম ১৫ হাজার অথবা ততোধিক? আজ এ বিষয়ে বিস্তারিত লিখবো;

বাংলাদেশে চশমার জগতে আজ পর্যন্ত কোন ব্রান্ড ভ্যালু গড়ে উঠেনাই, যেটা পার্শ্ববর্তী দেশ ইন্ডিয়া অথবা শ্রীলঙ্কাতে অনেকটাই গড়ে উঠেছে। ইন্ডিয়াতে অথোরাইজেশন ছাড়া কেউ কোন প্রকার ব্রান্ডের চশমা বিক্রয় করতে পারেনা। তাদের দেশে ব্রান্ড রেস্ট্রিকশন অনেক বেশি কার্যকর।

পক্ষান্তরে, বাংলাদেশে সসম্পুর্ণ উলটো চিত্র। এখানে প্রতিটি দোকানেই আপনি বিশ্ব বিখ্যাত সকল ব্রান্ডের চশমা পাবেন, সেটাও আবার মাত্র ২/৩ শ টাকা খরচ করলেই পাওয়া যায়। কাস্টমারদের একটা বড় শ্রেণী চশমার ব্রান্ডের বিষয়ে অবগত নয়। যেকোন দোকানদার দুই আড়াই হাজার টাকা দিয়ে একটা প্রোডাক্ট ধরিয়ে দিয়ে সেটাকে অরিজিনাল বলে চালিয়ে দেয়। কাস্টমারও দুই আড়াই হাজার টাকায় ব্রান্ডের অরিজিনাল চশমা পেয়ে খুশি।

কিন্তু ব্যপারটা আসলে তা নয়। একটি অথোরাইজড ব্রান্ডের চশমা ক্রয় করতে হলে কম পক্ষে ৭ হাজার থেকে এক লক্ষ টাকা পর্যন্ত খরচ হতে পারে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, একটা চশমা কেন এত দাম হবে? এই প্রশ্নের উত্তর হলো, সেটা আসলে চশমার দাম নয়। সেটা ব্রান্ড ভ্যালু। একটা চশমা যত ভালো মেটেরিয়াল দিয়েই তৈরি হোক না কেন, এটার প্রোডাকশন খরচ কোনভাবেই ২০/৩০ ডলারের উপরে যাওয়ার কথা নয়। মতান্তরে আরো কম। কিন্তু বিশ্ব বিখ্যাত ব্রান্ডগুলো একটা চশমার পেছনে প্রোডাকশন খরচের চেয়ে ব্রান্ডিং এ ব্যয় করে ৪/৫ গুন। কিছু কিছু ব্রান্ড মার্কেটিং এর পেছনে ব্যয় করে প্রোডাকশন খরচের প্রায় ৭/৮/ গুন। যেমন Cartier. এই ব্রান্ডের একটি চশমার প্রোডাকশন খরচ যদি হয় ৭০ থেকে ৮০ ডলার, তবে ব্রান্ডিং সহ এই প্রোডাক্টের দাম পড়বে ৫০০ ডলার৷ যার ফলে এক একটি Cartier Original ফ্রেম এর দাম অনেক বেশি চাওয়া হয় কাস্টমারের কাছে।

বিশ্বজুড়ে চশমা ও সানগ্লাসের বাজারে এ অনৈতিক বাণিজ্য করে আসছে ইতালির একটি প্রতিষ্ঠান, যার নাম Luxottica। বর্তমানে বিশ্বের নামি চশমার বাজারের ৩০ শতাংশেরও বেশি অংশ Luxotica নামের এ প্রতিষ্ঠানের একক নিয়ন্ত্রণে। তারাই নির্ধারণ করে prada, Rayban, Versace, Tiffany, D&G, Stepper, Oakley ইত্যাদির মত ব্রান্ডের চশমার দাম। বাজারে একচ্ছত্র ‘মাফিয়া’ বর্তমানে Luxottica. মূলত বর্তমানে সারা দুনিয়ায় ১১৪ দশমিক ৯ বিলিয়িন ডলারের (স্ট্যাটিস্টার তথ্য অনুযায়ী) চশমার বাজারে একচ্ছত্র ‘মাফিয়া’ Luxottica.

বিশ্লেষকরা বলছেন, বৈশ্বিক চশমার বাজারে এই প্রতিষ্ঠানের তীব্র মনোপলি চলছে। এ প্রতিষ্ঠানই ঠিক করে দিচ্ছে কোন ব্র্যান্ডের চশমার কেমন দাম হবে। পণ্যের মানের ওপর নয়, বরং এ দাম ঠিক করা হচ্ছে একটি নামি ব্রান্ডের অতি প্রয়োজনীয় পণ্য কিনতে খদ্দের কত টাকা খরচ করতে ইচ্ছুক তার ভিত্তিতে।

তাছাড়া অন্য পণ্যের বাজারে যেমন প্রতিযোগিতার সুযোগ রয়েছে, চশমার ক্ষেত্রে তেমন নেই। কারণ, এ বাজারে নিজের নিয়ন্ত্রিত ব্র্যান্ডের মধ্যে এক ধরনের ছদ্ম প্রতিযোগিতা টিকিয়ে রেখেছে Luxotica। অন্য কাউকে ঢুকতে না দিয়ে একাই নিয়ন্ত্রণ করছে বিখ্যাত সব ব্র্যান্ডের চশমা উত্পাদন থেকে গ্রাহকের কাছে বিক্রি পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়া। আর এর মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠানটি ইচ্ছেমত ক্রেতার পকেট কাটছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, Luxoticaর অধিগ্রহণের আগে রে ব্যানের যে সানগ্লাস গ্যাসস্টেশনেও মাত্র ১৯ ডলারে বিক্রি হতো, একই সানগ্লাস Luxotica তার নিয়ন্ত্রিত দোকানে এখন বিক্রি করছে ১৫০ ডলারেরও বেশি দামে।

বাংলাদেশে ব্রান্ডের চশমা আসলে কতটা আসল? প্রথম কথা হলো, বাংলাদেশে একটি গরিব দেশ। এখানে চশমার পেছনে ক্রেতা এত টাকা খরচ করতে চান না। তাই চশমার কোন ব্রান্ডেরই কোন অথোরাইজেশন নেই বাংলাদেশে। চায়না থেকে মুলত ফার্স্ট গ্রেড কপিগুলো বাংলাদেশে অরিজিনাল বলে বিক্রি করা হয়। এগুলোর কোয়ালিটি কোনভাবেই অরিজনাল কোয়ালিটির চেয়ে কম নয় কিন্তু উৎপাদন খরচ কম হওয়ায় এবং ব্রান্ডিং এর পেছনে কোন টাকা খরচ না হওয়ায় চায়না এত অল্পদামে অরিজিনাল কোয়ালিটির চশমা সরবরাহ করতে পারে। বাংলাদেশের চশমার দোকানগুলো মুলত কাস্টমারদের সাথে এই সুযোগটাই নিয়ে থাকে। তারা কপি প্রোডাক্টকে অরিজিনাল ব্রান্ড বলে চালিয়ে দেয়। যেহেতু যাচাই করার কোন উপায় নেই, তাই কাস্টমারও এখানে নিরুপায়।

ব্রান্ড মনোপলির কারণে, যে চশমার ফ্রেম তৈরিতে ২০ ডলার খরচ হয়, সেটি বিক্রি করছে অন্তত ১০০ ডলারে। আর তথাকথিত ‘ডিজাইনার ফ্রেম’ হলে দাম নেয়া হয় ২০ গুণ পর্যন্ত। এজন্যই ব্রান্ডের চশমার ফ্রেমের মুল্য এত বেশি।

0/5 (0 Reviews)
Spread the love

    Leave a Reply

    Your email address will not be published.

    ×





    X